October 15, 2026, 1:00 am
শিরোনাম:
পীরগঞ্জে জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। পূজা উদযাপন ও ধর্মীয় সম্প্রীতি: ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিমের করণীয় মুফতি শামীম আহমেদ। পীরগঞ্জে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস-২০২৬ উদযাপন বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে ফরিদপুরে ৪০ হাজার তালবীজ রোপণের উদ্যোগ সাঁথিয়ায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত, র‍্যালি-মহড়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত পলাশে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা ফরিদপুরে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দুইজন গ্রেপ্তার সাঁথিয়ায় প্রতিবন্ধীদের ভাতা নিশ্চিত করতে ইউএনওর উদ্যোগ, কার্ড করতে লাগবে না টাকা শ্যামনগরে ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি পুটিয়ার নতুন কারাগারের নির্মাণকাজ

পূজা উদযাপন ও ধর্মীয় সম্প্রীতি: ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিমের করণীয় মুফতি শামীম আহমেদ।

Reporter Name

পূজা উদযাপন ও ধর্মীয় সম্প্রীতি: ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিমের করণীয়
মুফতি শামীম আহমেদ।

মোঃ এরশাদ আলম শরিফ

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। প্রত্যেকের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ সময়ে একজন মুসলিমের করণীয় কী এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা কী—তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামে ধর্মীয় সম্প্রীতির শিক্ষা
ইসলাম শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সদাচরণের ধর্ম। ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ঘৃণা, অবিচার কিংবা বিদ্বেষ পোষণ করতে শিক্ষা দেয় না। বরং ধর্মীয় বিশ্বাসে ভিন্নতা থাকলেও মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত ও সদাচরণপূর্ণ আচরণের নির্দেশ দেয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন—
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
অর্থ: “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।”
—সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৬।
এ আয়াত ধর্মীয় বিষয়ে জবরদস্তি না করার মূলনীতি তুলে ধরে। তাই অন্য ধর্মের মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মীয় অধিকারকে সম্মান করা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা একজন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব।
অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন—
لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ
অর্থ: “যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।”
—সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত: ৮।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, শান্তিপূর্ণ অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার ইসলামের স্বীকৃত শিক্ষা। পূজার সময় প্রতিবেশী ও সহনাগরিকদের নিরাপত্তা, সম্মান এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সহযোগিতা করা এ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পূজায় মুসলিমের করণীয় কী?
ইসলামের দৃষ্টিতে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণ এক বিষয় নয়। একজন মুসলিম অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করতে পারেন, তাদের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াতে পারেন, বিপদে সাহায্য করতে পারেন এবং পূজার সময় আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সহযোগিতা করতে পারেন।
তবে ইসলামের আকিদা ও ইবাদতের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা অপরিহার্য। অন্য ধর্মের উপাসনা বা ধর্মীয় আচারকে নিজের ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা কিংবা ইসলামী বিশ্বাসের পরিপন্থী কোনো ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া থেকে মুসলিমকে বিরত থাকতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, ধর্মীয় শুভেচ্ছা বিনিময় বা সহযোগিতার বিধান পরিস্থিতি ও কাজের ধরন অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সাধারণীকরণ না করে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিবেশীর অধিকার ও মানবিক দায়িত্ব
ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবেশী মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম—তার সঙ্গে ভালো আচরণ করা, তার জানমাল ও সম্মান রক্ষা করা এবং কোনো ধরনের কষ্ট না দেওয়া ইসলামী নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পূজার সময় কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে গুজব না ছড়ানো, উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য প্রচার না করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। ধর্মের নামে সহিংসতা, প্রতিহিংসা কিংবা অন্যের উপাসনালয়ে হামলা কোনোভাবেই সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ হতে পারে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ন্যায়বিচারের শিক্ষা
ইসলাম মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন—
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
অর্থ: “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”
—সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৮।
এ নির্দেশনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মত ও বিশ্বাসে পার্থক্য থাকলেও ন্যায়বিচার থেকে সরে আসা যাবে না। ব্যক্তিগত বিরোধ, সামাজিক উত্তেজনা কিংবা ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে কারও প্রতি অন্যায় করা ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী।
সম্প্রীতি রক্ষায় সবার দায়িত্ব
ধর্মীয় সম্প্রীতি শুধু একটি সম্প্রদায়ের দায়িত্ব নয়; এটি সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব। মুসলিমদের উচিত নিজেদের ঈমান-আকিদা ও ইসলামী মূল্যবোধ অটুট রেখে অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ন্যায়সংগত ও মানবিক আচরণ করা। একইভাবে প্রত্যেক নাগরিকের উচিত অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করা এবং দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহার—সব ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থাকা একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
উপসংহার
ইসলামের শিক্ষা হলো—নিজের ধর্মের প্রতি অবিচল থাকা, অন্যের ধর্মীয় অধিকারকে সম্মান করা, মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করা এবং সর্বাবস্থায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। পূজা উদযাপনের সময় একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজের আকিদা ও ইবাদতের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে প্রতিবেশী ও সহনাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় সহযোগিতা করা।
মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় সম্প্রীতি মানে সব ধর্মের বিশ্বাসকে এক করে ফেলা নয়; বরং বিশ্বাসের ভিন্নতা বজায় রেখেও শান্তি, সৌহার্দ্য, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একসঙ্গে বসবাস করা। আসুন, আমরা বিদ্বেষ নয়—সদাচরণ; সংঘাত নয়—শান্তি; অন্যায় নয়—ন্যায়বিচারের চর্চা করি। ইসলামের মানবিক শিক্ষা ধারণ করে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গড়ে তুলি।